আনমনা প্রিয়দর্শিনী
ছি, ছি, কি একটা অবস্হা। একটা কিউট অসাম্প্রদায়িক জাতির মানুষ, তাও আবার ‘মেয়ে মানুষ’ হয়ে আমি কি ছাতা একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দাঙ্গা ছবি আঁকলাম। দুইদিন আগে রামু, উখিয়া, পটিয়াতে ২২টি বিহার-মন্দির পুড়ে ছাই করার আট বছর পার হলো। একজনেরও বিচার হয় নাই। তাতে কি? সবাই নাকি খুব সুন্দর খুল্লাম-খুল্লা বৌদ্ধদের সাথে মিলে-মিশে আছে, আত্মীয়রা আসলে টুরিস্ট স্পট থুক্কু নতুন বানানো বিহারে বুক ফুলায়ে বেড়াতে নেন, খুশিতে লেজ নাড়তে নাড়তে গৌতম বুদ্ধের মূর্তির কোলে উঠে ছবি তোলেন, বৌদ্ধ নারীর প্রার্থণা দেখে শরীরে শিরশিরে আনন্দ টের পান। প্রবরণা পূর্ণিমাও নাকি পুলিশী পাহারায় খুবই অসাম্প্রদায়িকভাবে পালন হয়। এই রকম একটা সম্প্রীতির মাঝে সাম্প্রদায়িকতার কথা ভাবা যায়? নাকি ভাবা উচিত? হতে পারে যে সপ্তাহে সারাদেশে অন্তত চার-পাঁচজন আদিবাসী, হিন্দু, বৌদ্ধ নারী ধর্ষিত হয়, তিন-চার জন তার ভিটে হারায়, খুনও হয় এক-দুই জন। চড়-থাপ্পর, গালাগালি এইগুলা আবার ধরতে হয় নাকি? তাই বলে আসলে আমরা কিন্তু সাম্প্রদায়িক না। এই দেশে দেয়ালে যত্ন করে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হয় “বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার মুসলিম ভাই ভাই।” তারপর একজন মডেলকে মুয়াজ্জিন সাজানো হয়, আরেকজনকে গেরুয়া পোষাকের পুরোহিত। খেয়াল করেন মুয়াজ্জিন সাইকেল চালান, মানে লিড দেন, পুরোহিত পেছনে বসা। মুসলমানেরই তো লিডিং পজিশনে থাকার কথা। যাই হোক সাইকেলের মাথা যখন “ভাই-ভাই” শব্দ স্পর্শ করি করি করে, তখন নাইকনের শার্টারে ক্লিক হয়। কতো কষ্ট করা লাগে এই শুটিংটা করতে, সঠিক শব্দের কাছে এসে সাইকেলের মাথাটা এনে ফোকাস ঠিক রেখে ছবিটা তুলতে, আপনার কি সেই বিষয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা আছে? এই এক ছবির ভাইরালেই তো তিন-চারটা শান্তিলতার খুন, চার-পাঁচটা বিহার-মন্দির ভাঙা, আর ডজন খানেক শীলার ধর্ষণ না দেখে, না শুনে কেমন একটা “আবেগে কাইন্দা লিসি” টাইপ অসাম্প্রদায়িক অনুভূতি নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া যায়। বেহুদা ক্যান আঁকলাম এই ছবি তাইলে? এই ধরেন ‘খুশিতে, ঠ্যালায়, ফেবুতে ঘোরতে’। এতো খুশির কারণ শুনাই তাইলে।
Artwork by Aanmona Priyadarshini (2020)
স্কুলে টিফি-ন টাইমে ফুলটোকা খেলা হবে। দলভাগ করতে গিয়ে ব্যাপক ঝামেলা। সবাাই গোলাপ টিমে থাকতে চায়, গেন্দা টি-ম প্রায় শূণ্য। ইস জ্যাকুলিন যদি সেই সময় “লাল গেন্দা ফুলের” শরীর ঝাঁকানো নাচটা দিতো তাইলে এই গ্যাঞ্জামের শুরুই হতো না। যাই হোক… কি করা যায় ভাবতে ভাবতে বাচ্চারা ঠি-ক করলো যে দুইটা টি-ম হবে, গোলাপ টিমে মুসলিমরা আর গেন্দা টিমে হিন্দুরা। ‘মালাউনের’ আন্ডা-বাচ্চারা একটু প্রতিবাদ জানিয়ে উপায় না দেখে রাজি হলো। মুশকিল হলো আমাকে আর এক বৌদ্ধ বাচ্চাকে নিয়ে। অনেক দরদামের পর সেই বাচ্চা হিন্দু টিমে জায়গা পেল। কিন্তু আমি আমার ধর্ম নিয়ে কনফিউজড। আমাদের যৌথ পরিবারে তখন বাড়িতে লক্ষী-সরস্বতী পূজা হয়, দূর্গা পূজার ফূর্তি চলে একমাস ধরে, ছোটমা (মাসি) রোজা রাখলে সঙ্গে মামনি, বৌমা, দিদিভাইও রাখে, আবার কোরবানীর হাটে আমাকে নিয়ে গিয়ে গরু-খাসি বাছাই করা হয়। কোনটা যে ধর্ম আমি বুঝতে পারি না। এক পিচ্চি বিষয়টা সহজ করার জন্য বলে “তোমার বাবার ধর্ম কি?” চিন্তা করেন ওয়ান-টুতে পড়া গুঁড়া বাচ্চা পরিবার-স্কুলে কি মারদাঙ্গা ট্রেনিং পায় – সে শুধু ধর্ম না, পিতৃতণ্ত্র আর ধর্মের পিরিতিটাও বোঝে। যাই হোক ধর্ম বলতে না পারায় আমাকে সেইদিন খেলতে নেয়া হয়নি। আমি দূরে দাঁড়িয়ে সেইদিন দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে অনেক কষ্টে কান্না আটকেছিলাম। কি জানি সত্যি সত্যি আটকাতে পেরেছিলাম কিনা।কিন্তু খেলাধূলার প্রতি আমার আগ্রহ কেন যেন কমতে থাকে এরপর থেকে।
বড় হয়ে গেছি অনেকটা। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়িয়ে শীতের ছুটির পর কলেজে ফিরলাম (নাম করা কলেজ কিন্তু, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ)। আমাদের সাথে একটা মিষ্টি মেয়ে যে ধর্মে ছিল খৃষ্টান সে ছুটিতে একটু ‘মুটিয়ে’ গেল। আমাদের অংকের শিক্ষক তাকে দেখে পুরো ক্লাসের সামনে বললো “ক্রিসমাসে আরও বেশী করে শূকর খাও। ঐসব গু-মুত খাইলে মোটা তো হবাই।” মেয়েটার ফর্সা গাল লাল হতে থাকলো অপমানে। আমি ম্যাডামকে বলি -“গরু খেয়েও তো ঈদে মোটা হই, হই না?” ম্যাডাম আমাকে মুখ ঘুরিয়ে বললো “তুমিও আবার গরু খাইয়া মোটা হও?…” পুরা ক্লাস ম্যাডামের রসিকতায় পেট চেপে হাসছে। আমি অনেক হাসি ভুলে গেছি, কিন্তু সেই হাসিটা এখনো কানে লেগে আছে।
ভার্সিটিতে পড়ি। এক শিক্ষক একদিন আমাকে ডেকে বলেন – “আনমনা তুমি যে হিন্দু সেটা কিন্তু তোমাকে দেখে বোঝা যায় না।” আমি তো টাসকি খেলাম। বিবাহিত হলে একটা কথা ছিল, মাথায় সিঁদুর, হাতের শাখার কথা বুঝিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু আমি তো বিবাহিত না। ঠি-ক কতোটা ফর্সা বা কালো, লম্বা বা বেটে, থলথলে বা ছিপছিপে, কোঁকড়া বা সোজা চুলের মানুষ হতে হয় হিন্দু হওয়া বোঝাতে গেলে? সেই একই শিক্ষক মাষ্টার্সে যাতে তার সাথে থিসিস করি তার লোভ দেখাতে গিয়ে বলেছিল “আনমনা তোমাকে ভার্সিটির শিক্ষক হতে হলে কিন্তু আওয়ামী লীগের ব্যানারে আসতে হবে। অন্য কেও তোমাকে (হিন্দু ইঙ্গিত করে) নেবে না। আফটার অল লয়্যালিটি বলে একটা ব্যাপার আছে।” সোনার ছেলে, মেয়ে, শিক্ষকের হাত-পা ধরে লয়্যাল থাকা আমার হয়ে ওঠে নাই।
আমি চাকরী করছি। খুবই শ্রেণীবিদ্বেষী একটা জায়গা। সেখানে বাকিদের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর, মন্ত্রী-মিনিষ্টারের ভাগিনা-ভাতিজী, পোলাপানরা কাজ করেন। সেই শ্রেণীরই সাসেক্স থেকে পড়াশোনা করে আসা এক মেয়ে আমারই বসের সামনে পূজার ছুটির আগ দিয়ে আমাকে বলে “আচ্ছা তোমরা তো গরু পূজা কর। কিন্তু গরু যদি স্টেজে (মন্ডপ বা তার ইংরেজী শব্দটা সে জানতো না) উঠে পু করে দেয়, it will be a mess. Right? How then you will handle the situation?” আমি অবাক মুখে বলি “I don’t handle others’ messes. I just ignore them and let them handle their own mistakes.” আমার বস তাকে কিছু বলে না, কান ফাটিয়ে হাসে। আর আমি বসে বসে ডেভলপমেন্ট সেক্টরের ডেভলপমেন্ট মাপি।
একবার আমার কাছে এক বিয়ের প্রস্তাব আসলো। ঠি-ক বিয়ে না বেহেস্ত যাবার প্রস্তাব। আমি বিয়ে করে মুসলিম হবো, মেয়ের মা হিসেবে মামনিও মুসলিম হবে।মরার পর এই নেক কাজের জন্য মা-মেয়ে দুইজনই বেহেস্ত যাব। ব্যাপারটা চিন্তা করেই তো মন ভাল হয়ে গেছিল। কিন্তু যখন ছাই দিয়ে ধরলাম তখন যিনি প্রস্তাব দিয়েছিল সে শেষ পর্যন্ত কোন গ্যারান্টি দিতে পারে নাই বেহেস্তে যাওয়া নিয়ে, বেহেস্ত যেতে না পারলে ক্ষতিপূরণ কি হবে সে বিষয়েও কিছু বলেন নাই। আমারে পাগলা কিছু একটা নিশ্চিত কামড়েছিল। কিন্তু বিনা গ্যারান্টিতে আমি বিয়ে করি নাই।অতো ভোদাই নাকি আমি?
দিদিভাই মারা যাবার বহু পরে আমার সদ্য পরিচিত একজন যে কিনা দিদিভাইকে চিনতেন না সে আমাকে বলেছিল যে হিন্দুরা নাকি মরার ঠিক আগে কলেমা পড়েন। এটা নাকি গীতাতে লেখা আছে যে কলেমা পড়তে হবে। আমি বুঝে পেলাম না শ্রীকৃষ্ণ হুদাই কেন অজুর্নকে ঐরকম একটা যুদ্ধের সিচুয়েসনে মরার আগে আল্লাহ্ এর নাম নিতে বলবেন। যাই হোক সেই পরিচিতার দাবী আমার দিদিভাইও মৃত্যু বিছানায় সেই কলেমা পড়েছে। আমি সেইদিন বিশেষ প্রয়োজনে ব্যাপক ভদ্র হয়ে ছিলাম। সেইদিনের অপমানটা ফিরিয়ে দেয়া হয়নি, একদিন ঠি-ক দেব।কিছু হিসেব আমার খুব পাকা।
ভাবতেই পারেন এইসব আমার অতি আবেগী বাড়াবাড়ি। কিংবা এগুলা একসেপসোনাল ঘটনা। আপনার সেই ভাবনা নিয়া আপনি ‘মাইনোরিটি’ অনেক সুখে আছে – এই টাইপ অসুখ নিয়ে ভাতঘুম দিতে পারেন। পাগলের সুখ মনে মনে। শিবু কাকুর বাড়িতে পূজার নাড়ুটা খেয়ে, সুবীর নামের সবচেয়ে মনের বন্ধুটার সাথে ঈদের ছুটি কাটিয়ে, অথবা প্রথম জীবনে প্রথম প্রেমে দিশা চাকমার মাঝে ডুব সাঁতরে আপনার নিজেকে মনে হতেই পারে ভীষণ অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু এই আপনি কাকীমা দূর্গা পূজায় আযানের আগ-পিছে ভুল করে শাঁখ বাজালে তার মাথা ফাটানোর বাসনা পোষণ করেন। বেস্ট ফ্রেন্ড সুবীরকে না বলে গরু খাইয়ে দিয়ে “কেমন ধরা খাইলি মালু?” বলে হাসতে হাসতে পিঠ চাপড়ান। বাবা-মা এর অমতে দিশাকে আপনার বিয়ে করা হয় না। কেও কেও যদি বা করেও ফেলেন, কিন্তু বিয়ের পর দিশার কপালের টি-প, হাতের লাল-চূড়ি, চোখের গাঢ় কাজল আপনার চোখে নেশা ধরায় না। আপনি পর্দার পেছনে এই রঙ, সাজ আড়াল করতে চান। আপনার গোলাপী শার্টের গোলাপী একটু বেশী হয়ে গেলে বান্ধবী আপনাকে গালি দেয় “ঢাকাইয়া কুট্টি” বলে, আর সেই একই বান্ধবী আহ্লাদে গদগদ হয়ে যখন আপনাকে বলে “জানু বড় বাপের পোলায় খায় থেকে ইফতার করি চলো” তখন আপনার জীবন স্বার্থক হয়ে যায়। অফিসে, বন্ধুদের আড্ডায় আপনি বসের বউয়ের ‘সিলইট্টা’ উচ্চারণ নিয়া হাসাহাসি করেন। আবার নিজে উত্তর বঙ্গের ‘মফিজ’ হওয়া থেকে বাঁচার জন্য একই আড্ডায় নিজ পরিচিতি ঢাকেন “আমি একভাবে ঢাকার ছেলে” বলে।
আপনি ২১ সে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বুক ফুলায়ে বৌ-বাচ্চা নিয়া পান্তা খান, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বাচ্চারে ইংলিশে বোঝান সালাম-বরকতের গল্প। আপনার বাচ্চার সাথে যেই এশা ত্রিপুরা বাংলা-ইংরেজীতে পড়তে বাধ্য হতে হয় সে কেন তার ভাষায় পড়তে পারে না তা জানান আপনার সন্তানকে? আপনার ঈদ এক দিনের, টেনেটুনে তিনদিনের। আপনি আগে পিছে শুক্র-শনি মিলিয়ে ১০-১২ দিনের ছুটি ম্যানেজ করে ফেলেন। দূর্গা পূজা ছয়দিনের। আমার মা-মামা কেন একদিন সরকারী ছুটি পায়? একটা দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম মেনে আপনি টেলিভিশনে ভাষণ দেন “বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চ্যাতনার দেশ….” আপনার চাইতে বেশরম একমাত্র আমি। কারণ দিনশেষে আমি আবারও আপনার, আপনাদের মতো নিরেট মূর্খ আর সাম্প্রদায়িক মানুষের কাছে অসাম্প্রদায়িকতা কি তার উদাহরণ দেই।
Aanmona Priyadarshini is a PhD candidate at University of Pittsburgh, USA. Her research examines intersections between materiality, violence, and social relations with a geographic focus in South Asia.
Print Friendly, PDF & Email
0 Shares

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *