ব্রাম আইভেন ও জান ওভারউইজক

অনুবাদ: শাওলী মাহবুব

[কোভিড-১৯ মহামারী ‘প্রাকৃতিক’ কিছু নয়: বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এই মহামারী তৈরি করেছে। কোভিড -১৯ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দূরত্বসহ অন্যান্য পদক্ষেপ সাধারণ ধর্মঘটের মতই। এটা আমাদের এই সময়টাকে নিয়ন্ত্রণে আনার একটি পরীক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। অনূদিত প্রবন্ধটিতে ব্রাম আইভেন এবং জান ওভারউইজক এইরকম কিছু কথাই বলতে চেয়েছেন। প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে ডি গ্রিওনি আমস্টারডামার ১৮ মার্চ ২০২০ সংখ্যায়।]

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে আকাশ থেকে নেয়া চীনের দুটো মানচিত্র প্রকাশিত হয়েছিল। বামদিকের মানচিত্রে দেখা যায় পুরো দেশের উপর কমলা রঙের নাইট্রোজেন মেঘ  ঘনীভূত হয়ে আছে, দেড় মাস পরে, ডান দিকের মানচিত্রে দেখা যায় সেই মেঘ উধাও হয়ে গেছে। কী হলো তবে? ফরাসি দার্শনিক লাতুর (Bruno Latour) একটি টুইটের মাধ্যমে স্যাটেলাইট ইমেজ দুটো প্রকাশ করে বলেন যে, একটি ভাইরাস এমন কিছু রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে ফেলল , যা চীনা রাষ্ট্র সবসময় অবিশ্বাস  করে আসছে। কোভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য কোয়ারান্টাইন শুরু এবং অভ্যন্তরীণ যান চলাচল বন্ধ করার কয়েক সপ্তাহ পরে ডান দিকের মানচিত্রে এমন পরিবর্তন দেখা যায়।

লাতুরের টুইট। মূল লেখা থেকে নেয়া।

কীভাবে আধুনিক রাজনীতির পুনর্ধারণায়ন সম্ভব লাতুর কয়েক দশক ধরে সেই পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন । লাতুর তাঁর “উই হ্যাভ নেভার বিন মডার্ণ (১৯৯৩)” বইতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত এই বিষয়টিকে আলাদাভাবে চি‎হ্ণিত করার উপর জোর দিয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারী তাঁর যুক্তি আবারও প্রমাণ করে দিল। প্রকৃতি এবং সংস্কৃতির যুক্ততা যেভাবেই কল্পনা করিনা কেন, একই সাথে এটা এও স্পষ্ট করে যে, সমাজের উপর বাস্তুতন্ত্রের এজেন্টগুলোর (Ecological agents) একটি শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের এই ধারণাগুলো নিয়ে আরো এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে: এটা আমাদের এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে যে, এই নতুন ‘বাস্তুতান্ত্রিক একটর’ তৈরিতে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কাজেই বলাই যায় যে, কোভিড-১৯ নামের তথাকথিত এই দানবকে আসলে আমরাই তৈরি করেছি।

জাপানের একটি শহর। সূত্র: ইন্টারনেট।

এটা মোটেই প্রাকৃতিক কোন বিষয় নয়

বৈশ্বিক অর্থনীতি সর্বদাই বাস্তুসংস্থানকে ব্যবহার করেছে, ফলে এটা মোটেই বিস্ময়কর নয় যে একটি নতুন ভাইরাস জন্ম লাভ করেছে এবং প্রায় আলোর গতিতে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ছড়িয়ে পড়া মোটেই প্রাকৃতিক কারণে ঘটেনি বরং অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলে এর বিস্তার দ্রুততর হয়েছে। যে অপ্রতিসমতা এই ভাইরাস বিস্তারে দেখা যাচ্ছে তা মূলত আর্থ-সামাজিক বৈষম্যকেই নির্দেশ করছে।

গ্লোবাল ভাইরোম প্রজেক্ট প্রধান ডেনিশ কেরোল বলেন, এধরনের ভাইরাসের মতো “যে হুমকির মুখোমুখিই ভবিষ্যতে আমরা হই না কেনো তা আসলে বর্তমানেও বন্যপ্রাণীগুলোর মধ্যে বিদ্যমান।” সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য বাজারগুলোতে বন্যপ্রাণীর চাহিদা বেড়েছে। বন্যপ্রাণী বিপণনের সাথে সাথে আমরা হাজার বছর ধরে মানুষের সাথে সংযোগ বন্ধ থাকা এক বাস্তুসংস্থানের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার খুব কাছাকাছি চলে গেছি। অপরদিকে, “Big Farms Make Big Flu” বইয়ের প্রণেতা রব ওয়ালেস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বনবিনাশ করা এবং বন্যপ্রাণীর বাজারজাতকরণের ফলে নতুন অনেক জীবাণু যেগুলো দীর্ঘ-কালের প্রক্রিয়ায় বনবাস্তুসংস্থানে প্রতিরুদ্ধ অবস্থায় বা সংযত অবস্থায় ছিলো, সেগুলো এখন অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পুরো বিশ্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এবং প্রতিবেশ-উপনিবেশিকতা বিপর্যয়ের এই ফাঁদই করোনা ভাইরাস মহামারী এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর ধ্বংস ডেকে এনেছে।

এটা বাইরের কোন শক্তি নয়

উপরোক্ত বিষয়সমূহ ভাইরাস এবং রাজনৈতিক নির্দেশনার মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। এটা বললে আসলে খুবই সরলীকরণ করা হবে যে, কোভিড-১৯ ভাইরাস একটি অনুপ্রবেশকারী এবং সমাজের বাইরে থেকে আমাদের হুমকি প্রদান করছে। সমাজ এবং ভাইরাসের সংযোগ দেখাতে অনেক রাজনীতিবিদের মতো বেশিরভাগ মানুষও কুণ্ঠা বোধ করেন। তারা এমন কাঠামোমাফিক ভাবতে ভালোবাসেন যে, এটা অপরিহার্যভাবেই সমাজ থেকে আলাদা, বহিরাগত ও অনুপ্রবেশকারী যা আধুনিক সমাজকে হুমকি প্রদান করছে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোভিড-১৯ কে “চাইনিজ ভাইরাস” বলছেন, যা আসলে হাইপারন্যাশনালাইজড বা অধিজাতীয়তাবাদী এবং একটি বর্ণবাদী রূপক। এটি জেনোফোবিয়া বা বিদেশীদের সম্পর্কে অহেতুক ভয় বাড়ায় এবং মহামারীটি মানুষের কোন কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন ধারণাকে পোক্ত করে। উপরন্তু, বিগত বছরগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে বরখাস্ত করেছেন যারা তাকে এই মহামারী পরাস্ত করতে সহয়তা করতে পারত।

প্রেসিডেন্টের এই প্রতিক্রিয়া বাইরে থেকে সমস্যা সমাধানের মতো এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত বিরোধিতার প্রতীকবিশেষ যা বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকরা এখনও নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেন। ই ইউ স্লোগানে এই ভাইরাসকে চিত্রায়িত করা হচ্ছে বায়োটেররিস্ট বা জৈবিকসন্ত্রাসী হিসেবে যা আমাদের “জীবন যাত্রাকে” সাময়িকভাবে ব্যাহত করছে।

ভাইরাসটি একটা ‘রাজনৈতিক একটর’, যা সহজাতভাবেই বাস্তুসংস্থানের সাথে যুক্ত বিশেষত সেই বাস্তুসংস্থান যা কিনা মানুষ দ্বারা সহ-নির্মিত। এছাড়াও, ভাইরাসটি আক্ষরিক অর্থে এবং রূপক অর্থে উদারনৈতিকতা-পুঁজির বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি মিউটেশন বা পরিব্যক্তি। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, উপরোক্ত সিদ্ধান্তগুলো টানার পরিবর্তে বরং রাজনীতিবিদগণও তড়িঘড়ি করে ভাইরাসটিকে বাইরের শত্রু হিসেবে ছাপ মেরে দিতে ব্যাপকভাবে উৎসাহী। শেষকালে এটা আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় যে, ভাইরাসটি আদৌ কোন বিকার নয় বা এটা কোন দানবও নয়; এটা বরং বাস্তু-ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদের মধ্যকার বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের বিভৎসতা বিশেষ।

এটা ব্যতিক্রমী কিছু নয়

বেশির ভাগ ইউরোপিয়ান দেশগুলোর রাজনীতিবিদরা কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে খুব ধীর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। গতসপ্তাহগুলোতে প্রাথমিকভাবে নেয়া বেশিরভাগ সরকার কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থাসমূহ উদারনৈতিক নিয়মাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো। কোভিড-১৯ একটা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মনুষ্য-সমাজে প্রবেশ করেছে, এর সাথে কোন কিছুরই সম্পর্ক নেই এবং এমনকি উদারনৈতিক রাজনীতির সাথেও এটা দূরবর্তী সম্পর্কিত এমন সব উদ্ভট বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ব্যবস্থাগুলো নেয়া হয়েছিলো। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পদক্ষেপগেুলোর ফলে কী ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় হবে তার উপরই মূল দৃষ্টি ছিলো – কোভিড-১৯ কী ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে তার উপর নয় ।

ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে, সম্পূর্ণভাবে অপ্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের আহবান ছিলো এমন যে, হাত ধোবেন, কর্মে যুক্ত থাকবেন এবং ভোগ করবেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে, সারাবিশ্বব্যাপী সরকারসমূহ আরো ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়; যদিও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃংখল, উৎপাদন এবং ভোগের উপর বাড়তি কোন বোঝা না চাপিয়েই তা করা হয়।
চিন যখন ক্রমেই এই প্রাদুর্ভাব থেকে মুক্ত হচ্ছে তখন অন্যান্য দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া এবং বেশিরভাগ ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো তখন তৃতীয় ধাপে পৌঁছেছে , যুক্তরাষ্ট্র তখনও পিছিয়ে। ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম সম্পূর্ণভাবে লকডাউন করেছে। জার্মানি দুজনের বেশি লোকের সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং হাঙ্গেরি অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শেঞ্জেন জোন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে এবং বিশ্বের বহু দেশ তাদের দেশের সীমারেখা বন্ধ করে দিয়েছেপরিস্থিতির ভয়াবহতা অবশেষে সবাই বুঝতে শুরু করেছে: সমস্ত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবন স্থবির হয়ে গেছে, শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো চালু আছে।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত রাজনীতিবিদরা এবং অধিকাংশ মানুষই বাস্তুসংস্থানের সাথে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে জরুরিভাবে চিন্তা করছে না বা করতে আগ্রহী নয়। এখনও পর্যন্ত বেশির ভাগ মানুষ ভাবছেন এটা একটা ব্যতিক্রমী সময় অথবা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্বৈরাচারী শাসনের আরেকটি সুযোগমাত্র (যা আসলে সত্যি)। উপরের পদক্ষেগুলো আসলে রাষ্ট্রের শরীর থেকে ভাইরাস দূরীকরণের ব্যতিক্রমী কৌশল হিসেবে নেয়া হয়েছে। আমরা যখন নেদারল্যান্ডস থেকে লিখছি, তখন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিচ্ছেন যে, “নেদারল্যান্ডস এখন রোগী”। এটা যেন এমন যে ভূঁতপ্রেত ঝাঁড়ার মতো করে আক্রমণকারীকে ঝাঁড়তে হবে এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

কিন্তু এই ব্যতিক্রমী কৌশল যদি বৈশ্বিক উদারনৈতিকবাদের স্বাভাবিক অবস্থা হয়, তবে চরমাবস্থা হলে কী হবে?

আমরা আসলে এভাবে বলতে চাইনা যেভাবে “আইএল মেনিফেস্টো” সংবাদপত্রে ইতালির দার্শনিক জর্জিও আগামবেন বলেছেন যে, সরকার আসলে একটা মহামারী তৈরী করেছে তার স্বৈরাচারিত্ব পোক্ত হওয়াকে বৈধতা দেবার জন্য। প্রকৃতপক্ষে, কিছু ডানপন্থী উদারনৈতিক এবং অনুদার সরকার এই সঙ্কটকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পালনীয় আইন জারি করছে সেগুলোর উপর আসলে দৃষ্টিপাত করা উচিত।

এসবের পরিবর্তে আমরা যার উপর জোর দিতে চাই তা হলো, এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, পুরো ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া জুড়ে উদারনৈতিকতাবাদ এবং অনুদার সরকারগুলো ভাইরাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যুদ্ধটিকে ব্যক্তিমালিকানাধীকরণ করার দিকে এবং একই রকমভাবে শ্রমিকের অনুপস্থিতিতে বা শ্রমিককে অস্বীকার করে হলেও পুঁজিকে সংরক্ষণ করার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। উল্টোভাবে, এটা একেবারেই সেই ঘটনা যেখানে উদারনৈতিকতাবাদ সবসময় সংহতির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং শ্রমিককে শাসন-শৃঙ্খলে রাখতে চেষ্টা করে ।

এটা একটা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি

নব্যউদারনৈতিকতাবাদ সবসময়ই নিয়ন্ত্রণের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। খুব সতর্ক মাত্রার ডোজ এবং সঞ্চালনের মাধ্যমে এটা যে কোন সঠিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অন্য অর্থে যৌথ সংহতি এবং সাম্যের রাজনীতিকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। করোনা ভাইরাসের মতো গণতান্ত্রিক রাজনীতিও “বাজার-মুখ্যতার বা প্রাধান্যের” বিরুদ্ধে হুমকিস্বরূপ। উদারনৈতিকবাদের প্রবক্তাদের অন্যতম ফ্রেডরিক হায়েক তাঁর “ল, লেজিসলেশন এন্ড লিবার্টি (১৯৭৯)” বইটিতে এ বিষয়ে খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, “রাজনীতিকে অবশ্যই সিংহাসনচ্যুত করতে হবে।”

রাজনীতিতে আমরা যে পরিবর্তনই করতে চাই না কেন, জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে আমরা যতোই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করি না কেন, বা যতোই সংহতির প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাবনা দেখাই না কেনো, দেখা যাবে তা রাজনীতিবিদদের দ্বারা কোনো না কোনো চরম উপায়ে অবজ্ঞার শিকার হয়েছে। বাম থেকে ডানে সবখানেই একটা সময় যে আপ্তবাক্য দেখা যেতো সেটা খুব অপ্রাসঙ্গিকভাবে অনুভূত হচ্ছে: “এই অবস্থার কোন বিকল্প নেই”।

সত্যিই কি কোন বিকল্প নেই? স্ব-বিরোধী হলেও সত্যি, করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপগুলোই এই বিকল্প ভাবনার উপায়গুলোর উপর আলোকপাত করেছে।
একটা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সবাই প্রায় একমত যে, সামাজিক দূরত্ব এবং বিচ্ছিন্ন থাকা হলো করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ এবং ছড়িয়ে পড়াকে ধীর করে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী। প্রায়োগিক অর্থে, অর্থনীতির মূল একটি ধমনীকে, দিনে আট ঘণ্টার কর্মপ্রবাহ, সাময়িকভাবে আমাদের কেটে ফেলতে হবে অথবা পুরোপুরি পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

সম্মিলিতভাবে স্ব-বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক দূরত্ব, এখন যা স্বেচ্ছায় মেনে চলছি আসলে সেটা সাধারণ ধর্মঘটের আনুষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য। শ্রম এখন যেহেতু প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে, যা ইতোমধ্যে কাজকে কাঠামো প্রদান করেছে, এই ধরণের নকল ধর্মঘট অনভিপ্রেতভাবে সেখানে কার্যকরী। ন্যূনতম পক্ষে, বাড়ি থেকে কাজ করা ব্যাপকভাবে একটা পরীক্ষণ। একে আমাদের ঘুম থেকে জাগার সময় এবং সময় নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার পরীক্ষা হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। অথবা ভাবা যেতে পারে কাজের গতিশীলতা ও নমনীয়তার উপর উদারনৈতিকদের অতিভক্তি থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি হিসেবেও। আমাদের এটাও মেনে নিতে হবে যে, এই সময়ে কম কাজ হবে, প্রকৃতপক্ষে কম কাজ থাকবে । আমরা আসলে দিনে এবং সপ্তাহে কম কাজের অনিশ্চিত সীমাসূচকরেখার সাক্ষী হয়ে থাকছি।

স্বেচ্ছা-অন্তরীণ (self-isolation) এবং সামাজিক দূরত্ব দিয়ে ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করার একটা অনিচ্ছাকৃত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে পরিশোধিত শ্রম-প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের সাথে জীবনকে ঘিরে থাকা বাস্তুসংস্থান বিনষ্টকরণ বা রক্ষণের একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে।

কাজেই এমন ভুতুড়ে অসংলগ্ন অবস্থার মধ্যেও একটা  আশাবাদের ঝলক আছে আর তা হলো, আমরা কম কাজ করছি, আমাদের নিজেদের সময়ের উপর বেশী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছি। এটা অবশ্য টিমটিমে একটা ঝলক মাত্র। একই সঙ্গে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, কাজের জন্য যুদ্ধ এবং মজুরির যুদ্ধ দুটোই স্বতন্ত্র, যদিও সম্ভাব্য একইসাথে-ঘটমান, রাজনৈতিক কাজ। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৬৮ সালের বিদ্রোহীরা যখন শ্রমমজুরির অবসান চেয়েছিল, পরিবর্তে তারা তাদের স্থায়ী চাকুরীর অবসান দেখেছিল। ফলাফল ছিলো শ্রমিকদের ব্যাপক হারে অনিশ্চিত জীবন যারা কিনা এই আশাবাদী সময় থেকে বাদ পড়ে বরং এখন আয় হারানোর ঝুঁকিতে আছে অথবা একটা বৃহৎ ঘরবন্দী শ্রমিক গোষ্ঠীর খাবার সরবরাহর কাজে নিয়েজিত থেকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে । 

একটি নতুন রাজনীতির শুরু

এটা কৌতুহল-উদ্দীপক যে, কোভিড-১৯ এর সময় আমরা যা দেখছি তা জলবায়ুকর্মীরা দীর্ঘকাল যাবৎ দাবি করে আসছিলেন; যেমন: কম ভ্রমণ, কম কাজ, এবং পরিবেশের কম ব্যবহার। তারা বারবার বলেছেন যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে একটা স্থির অবস্থায় আনতে হবে এবং আমাদের উৎপাদনের মাত্রা কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার মানে হলো কম কাজ করতে হবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ভেঙে দিতে হবে। যেহেতু কাজ করতে যাবার সাথে এখন জীবন এবং মৃত্যুর সম্পর্ক জড়িত কাজেই এটা পরিষ্কার যে, কাজ আসলে রাজনীতি এবং বাস্তুসংস্থান সংশ্লিষ্ট। আমাদের কেবল এই যুক্তিটিকে প্রসারিত করে আরো বড় হুমকি যেমন: বাস্তুসংস্থানের ভেঙে পড়ার উপর জোর দিতে হবে।

লকডাউনের সময় ভারতের একটি শহর। ছবি ইন্টারনেট থেকে পাওয়া।

আমরা এখন  যেহেতু এই রাজনৈতিক মুহূর্তে পৌঁছেছি, আমাদের অবশ্যই বিদ্যমান সবকিছু এবং নব্যউদারনৈতিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ থেকে সরতে হবে।একই সঙ্গে একটি নতুন রাজনীতির সূচনা করতে হবে। করোনা মহামারী হলো মানুষ এবং সমাজের জন্য ভীষণ এক ট্র্যাজেডি; কিন্তু, তারপরও, বা এ কারণেই হয়তো বাস্তবিক অর্থে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সময়ও এটা।

এই ঘটনাগুলোকে আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট সংহতি এবং পারষ্পরিক নির্ভরতা একটা আনুষ্ঠানিক রাজনীতির দরোজা খুলে দিয়েছে, যা এই রাজনীতি রক্ষা করতে গিয়ে ভাইরাস দমনে কিছু ছাড় দিচ্ছে। এটা সেই সংহতি যা নব্যউদারনৈতিকতাবাদ গত কয়েকদশক যাবৎ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে আসছিল।

এখনই বলার সময়: আর না, এখনই এই আগল ভেঙে ফেলার সময়।

যা এখন জরুরি

এখন যেহেতু সময় এসেছে সমাজ এবং বাস্তুসংস্থান নিয়ে কাজ করার, কাজেই এটা কিছুতেই ভাবা যাবে না যে, বাস্তুসংস্থান আলাদা, সমাজের বাইরে তার অবস্থান এবং আমরা একে ইচ্ছে মতো শোষণ, ব্যবহার এবং নি:শেষ করে দিতে পারি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে একটু আলাদাভাবে বুঝতে হবে। লাতুর যেমন স্পষ্টভাবে বলেছেন: আমাদের বাস্তুসংস্থান, তার সমস্ত জটিলতা নিয়ে একটা ‘রাজনৈতিক একটর’, যা অন্যান্য সাধারণ নাগরিকের মতোই সমাজের অংশ। সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি কখনোই একটা আরেকটার বিপরীত নয় বরং চূড়ান্তভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িত।

করোনা ভাইরাস যেমন সমাজের একটা অংশ, আমাদের নৈমিত্তিক জীবন আমরা যেভাবে সাজাই এবং আমরা যেসব কাজ করি তাও ওতোপ্রোতভাবে বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের সাথে যুক্ত। এই পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে এটা একটা দুর্দান্ত পাঠ।

ছবি: ঢাকার একজন এ্যাকটিভিস্ট এর ব্যক্তিগত ফেইসবুক পাতা থেকে নেয়া

কাজেই আমরা যদি নব্যউদারনৈতিকতাবাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে চাই, তবে আমাদের গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কিছু প্রতিপাদ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে: যেমন আমাদের বাস্তুতন্ত্র এবং জীবনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান সমূহ এবং সকল কাজ এদুয়ের মাঝে রেখেই সম্পন্ন করতে হবে। এটা সমাজ পরিবর্তনের বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দেয়, যা কিনা প্রায়শই নতুন সবুজ চুক্তির (Green New Deal) জন্য দাবি-দাওয়ার মধ্যে ধরা পড়ে । ব্যবসার জন্য আর নতুন কোন প্রতিশ্রুতি নয় বরং মানুষ এবং পৃথিবীর জন্য প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এখনকার দাবি হলো আমাদের সমাজগুলোর জলবায়ুর প্রশমনের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ, উৎপাদন কমানোর জন্য নীতি প্রয়োগ এবং পরিবেশের সাথে একটি আলাদা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করা। আমরা যেহেতু বিকল্প কর্মপ্রতিষ্ঠানের কথা ভাবছি সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই সবাইকে সবধরনের সুবিধা এবং অসুবিধা দুটোই ভাগাভাগি করে নিতে হবে। কোভিড-১৯ মহামারী এটাও দেখিয়েছে যে, বিকল্প পদ্ধতিতেও কাজ করা সম্ভব।

 

Photo: Anthropology Journal

অনুবাদ: শাওলী মাহবুব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। মূল লেখা:  ব্রাম আইভেন, Leiden University এ শিক্ষকতা করেন। জান ওভারউইজক  ডক্টরাল শিক্ষার্থী, University of Amsterdam.

 

 

Print Friendly, PDF & Email
437 Shares

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *