শরৎ চৌধুরী 
তো আপনারা কি ভেবেছিলেন? মানুষ পালে পালে জড়ো হবে না? ইতিহাসে স্পষ্ট যে মারতে এবং মরতে সবসময়ই মানুষ পালে পালে জড়ো হয়েছে। বাঁচতেও জড়ো হয়েছে। প্রতিবাদে জড়ো হয়েছে। আনন্দে জড়ো হয়েছে, শোকে জড়ো হয়েছে। পালে পালে জড়ো হওয়ার মধ্যে অসম্মানের কিছু নাই।
জড়ো হবার ম‍ধ্যে যে সম্মান অসম্মান জিনিসটা আছে তা বানিয়ে দেয়া। জড়ো হওয়া বিষয়টা রাজনৈতিক। বুঝতে পারছেন না বিষয়টা?
তাহলে মানুষের সাথে আপনার যোগাযোগ কম। বাংলাদেশের ও বিশ্বের সাথেও আপনার যোগাযোগ কম। নিজের সাথে তো যোগাযোগই নাই। কেন?
পালে পালে মানুষের মধ্যে নিজেকে দেখতে/ভাবতে খারাপ লাগে? মানুষের পাল দেখলে বা শুনলে আধুনিক মানুষের খুব গায়ে লাগে। সে ভাবে একটা বিরাট ইন্ডিভিজুয়াল, যারে ডিভাইড করা যায় না, একদম আলাদা। আরে খেয়াল করুন, আপনিও বহু ইমাজিনারি পালের অংশ। এই ফেইসবুকে আপনারা পালে পালে জড়ো হয়েছেন না? একটা প্রোফাইল দিয়ে দিয়েছে বলে ততটা পাল পাল লাগেনা এই তো? রাষ্ট্র তো নিজেই পালে পালে মানুষ থাকার ভূগৌলিক সীমা।
তো পাল নিয়া এত প্রেজুডিসড হইয়েন না। যেই দেশের জনসংখ্যা  কম, সেইখানে পাল আর শারীরিক দূরত্ব একটি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বিষয়। জম্বি সিনেমায় দেখেন না, পালে পালে মানুষ আসলেই কেন আসল ভয়টা শুরু হয়? এটা কি জড়ো হবার ভয় না? যারা অনিয়ন্ত্রিত?
পাল ঘৃণা কইরেন না। আপনি পালের দেশের লোক। গায়ে গায়ে জড়ো হওয়া মানুষ আপনার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। কই পালে পালে জড়ো হওয়া আন্দোলোন তো ভালৈ লাগে, পালে কনসার্টে যেতে ভালো লাগে, পালে পালে বাজারে যেতে? পালে পালে বক্তৃতা শুনতে? এইটা পালের রাজনীতির দেশ, জড়ো হওয়া মানুষের রাজনীতির রাষ্ট্র। অন্য দেশের সাথে তুলনা করি? করোনাকালে ২০২০ এর ২৫শে মার্চ এর শিরোনাম দেখি। বিরাট ধনী দেশ আমেরিকার সিবিএস নিউজের একটা প্রতিবেদনঃ Spring breakers say corona virus pandemic won’t stop them from partying আবার বিরাট উন্নয়নের দেশ বাংলাদেশের ২০২০ এর ১৮ই এপ্রিলে শিরোনাম কি? করোনাতেও বাংলাদেশের ব্রাম্মণবাড়িয়ায় জানাজায় মহাসমাবেশ।
এই দুই জড়ো হওয়া ঘিরে আপনার অনুভূতি কী? একটি কি অপরের চাইতে বেশি সম্মানের বা অসম্মানের? জড়ো হবার ক্ষেত্রে বিশ্বাস, পেট, ক্ষুধা আর রাজনীতি একসাথে কাজ করে তখন এটাই ঘটবে। উদাহরণ ১. যাদের পেটে ক্ষুধা নাই, মনে অনেক ক্ষুধা, পকেটে টাকা আছে, আর আছে বিরাট আত্ম-বিশ্বাস, তারা মায়ামি বিচে পাল বাইন্ধা পার্টি করছে। উদাহরণ ২. যাদের পেটে ক্ষুধা, পকেটে নাই টাকা আর আছে বিশ্বাস তারা জানাযায় বিরাট সমাবেশ করছে। দুটোই রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে জড়ো হওয়া নিয়ে, সো কল্ড সেকুলার আর রিলিজিওসিটির মারামারি এইটা না, মানুষে আসেন। মানুষের জড়ো হবার রাজনীতিকে দেখেন। আর এখানেই একটা কিন্তু আছে! সেই কিন্তুটা হইল, মানুষরে পাল হিসেবে ম্যানেজের দ্বায়িত্ব কার? কে দেখায় পাল সামলানোর কৌশল আর কারা করে নিয়ন্ত্রণ আর কারা করে ব্যবসা?
ঠিক এখানেই দেখবেন পাল বিষয়ক একটা বিরাট অত্যাচারী, নিষ্টুর মনোভাব আছে। পালের রাজনীতিও পাল নেতৃত্ব দিয়ে চালিত। পাল সামলানোর চাইতে পালের কয়েকজনকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। তাই এক পালের সাথে অন্য পালের মারামারি লাগানো সহজ। এখানে, দুই দলেরই বিশ্বাস করোনাতে তাদের কিছু হবে না। কোন বিশ্বাসকে ছোট বড় দেখার কিছু নাই। আবার দুই দলের প্রণোদনা এক নয়। একদল ব্যক্তি স্বাধীনতার আত্মবিশ্বাস নিয়ে আরেকদল গোষ্ঠী চেতনার আত্মবিশ্বাস নিয়ে জড়ো হবার জন্য ঝাপিয়ে পড়েছেন। আর আপনার করোনা সচেতন মন বলছে, বিষয়টা ঠিক হচ্ছে না। যদিও মোটিভেশনের দিক দিয়ে দুইটাই তাদের জীবনের বিশ্বাস। তো দোষ খালি এক পক্ষরে কেন দেন?
এইখানে আমরা আমেরিকার মতই খারাপ বা আমরা খুব ভালো বলে খুশি হবার কিছু নেই। করোনা কালে দুইটাই খারাপ। গল্পটা মোটিভেশনের। পেটে খাবার না থাকলে মানুষ বাজারে যাবেই, গার্মেন্টসে যাবে, আবার অতি ভরাপেটের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে, তার ভালো লাগা আর স্বাধীনতা উদযাপণ করতে মানুষে বিচ পার্টি করবে। সবই ক্ষুধা। খাদ্যহীনতা আর অতিভোগ দুইটাই ক্ষুধা। এই ক্ষুধা নির্মিত। যে সময়টা, মনোযোগটা আর আর্থ সামাজিক শক্তি দিয়ে সচেতন আচরণ তৈরির কাজটা করার দরকার ছিল সেই বিনিয়োগ দুই পক্ষের কেউই করেন নাই। লোভ আর দুর্নীতির ব্যবসা এই টাকাটা, এফোর্টটা ধংস করে দিয়েছে। এখানে কেবল শিক্ষা আর জনসংখ্যার পরিসংখ্যান কেউ দিয়েন না। এমনকি বিশ্বাসের রাজনীতিরও না। রাষ্ট্র চাইলে পারে। সেটাকে চাওয়াইতে হয়। কিন্তু আপনেরা কীভাবে চাওয়াবেন?
আপনারা না মারামারিতে ব্যস্ত? আরেকদল তো ভোগে ব্যস্ত। যেটা করার ছিল কয়েক দশক ধরে তা হয় নাই, খালি বিশেষ ধরনের জনসমাগমের উদযাপণ হয়েছে, এক পালের সাথে অপর পালের মারামারি লাগানো হয়েছে । পালকে নির্বোধ বানানো হয়েছে। তো এখন সেকু্যলার আর রিলিজিয়াসরা মারামারি করেন ফেইসবুকে। করোনাতো আপনাদের আলাদা করে যে আক্রমণ করবে না সে কথা আগেই পরিষ্কার করে দিয়েছে।
শরৎ চৌধুরী, পোস্ট ডক্টোরাল গবেষক, হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় ।
Print Friendly, PDF & Email
0 Shares

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *