সাখাওয়াত হোসেন

তারেক মাসুদ আমাদের দেশের সেই ক্ষুদ্র সংখ্যক চলচ্চিত্রকর্মীদের একজন  যিনি  চলচ্চিত্রে  প্রবল ইতিহাসের  বাইরে নিম্নবর্গের মানুষের কথা ভেবেছেন। চলচ্চিত্রকে চিন্তা প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কল্পনা করার শক্তি তিনি পেয়েছিলেন তাঁর প্রথম প্রামাণ্য চলচ্চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন নিয়ে করা ‘আদম সুরত’(১৯৮৯) থেকে। একটি সাক্ষাৎকারে [1] ) তিনি বলেন, “সুলতান অন্যকে বদলে দেন নি নিজে বদলে গেছেন গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে যেয়ে”। সুলতানের মতন তিনিও উপলব্ধি করেন যে এই দেশের ইতিহাস এই গ্রাম বাংলার কৃষকের ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস। অকপটে স্বীকার করেছেন যে সুলতানকে নিয়ে করা চলচ্চিত্রটি তাকে চলচ্চিত্র সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

১৯৭১ সালে লেয়ার লেভিনের ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ নিয়ে তারেক মাসুদ এবং ক্যাথরিন মাসুদ ‘মুক্তির গান’(১৯৯৫) চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রে তিনি দেখিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ কীভাবে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই চলচ্চিত্রে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের এমন এক পরিবেশনা যা দেখলে আমরা হারিয়ে যাই ১৯৭১ সালের সেই গ্রাম বাংলায়, যেখানে স্বাধীন বাংলার জন্য একদল তরুণ-তরুণী গান গাচ্ছে আর মানুষকে মুক্তির স্বপ্ন দেখাচ্ছে। চলচ্চিত্রটিতে বৃহত্তর অর্থে জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন যেখানে ভাবাবেগের উপস্থিত অনেক। মোটাদাগে ‘মুক্তির গান’ এ দেখানো হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যেখানে শহরের তরুণ-তরুণীদের আবেগ, জাতীয়তাবাদের উত্তেজনা, যুদ্ধের দামামা প্রাধান্য পেয়েছে।

তারেক মাসুদ গ্রামে গ্রামে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শন করার সময় খুঁজে পান মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এতই গৎবাঁধা আর সরল কোনো বিষয় নয় এমন উপলব্ধি তিনি অর্জন করেন ‘মুক্তির গান’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। প্রত্যেক নগরে নগরে গ্রামে গ্রামে আছে এর বিভিন্ন না জানা গল্প। এই সব মানুষের  গল্পে  ভাবাবেগের স্থান কম, আছে জীবন সংগ্রামের কথা। এই মানুষদের কথা তুলে ধরেন তারেক মাসুদ তার মুক্তির কথা (১৯৯৯) চলচ্চিত্রে। এই প্রসঙ্গে একটি লেখায় তিনি বলেন: “১৯৭১ সালে বাস্তবে কী ঘটেছে, তার চেয়ে এ সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃষ্টিকোণ অনেক গুরুত্ব বহন করে…মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে যে উপাখ্যানটি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ভাবাবেগ বেশি এসেছে, এসেছে একরৈখিকতা…মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা, দ্যোতানার দিকটা, এর ধূসর ভূমির অংশটি, মুক্তির দিকটি না এসে যুদ্ধের দিকটি এসেছে”। ( মাসুদ, ২০১২)

মুক্তির কথায় দেখা যায় পাকসেনাদের কবর বাধাই করা এবং অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধার মায়ের কবর নিতান্ত অবহেলায় পড়ে আছে। প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যে কী পরিণতি হয় তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় এই ছবিতে। এ প্রসঙ্গে জাকির হোসেন রাজু বলেছেন, “ বাংলাদেশে এবং বেশির ভাগ দেশেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যারা সম্মুখ যোদ্ধা তাদেরকে বেশি সম্মানিত করার একটা প্রবণতা আমরা দেখি।…সম্মুখ যোদ্ধাদের অবশ্যই  গুরুত্ব আছে কিন্তু আমি বলব যারা পশ্চাত যোদ্ধা, যারা তাদের সামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধ করেছে, সেই লড়াইটাও কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ…মুক্তিযুদ্ধের যে বহুমাত্রিক চরিত্র সেটা আমাদের চলচ্চিত্র পর্দায় এখনো অনুপস্থিত। ( রাজু, ২০১৩)”

‘মুক্তির গান’ প্রদর্শনের সময় শহর এবং গ্রামের মানুষের মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা যায়। শহরে যেমন মানুষের চেতনা উজ্জীবিত করার একটি প্রবণতা দেখা যায় অন্য দিকে গ্রামে প্রদর্শনের সময় গ্রামের মানুষ নিজ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে অজানা ইতিহাস তুলে ধরে। এরকম একটি ঘটনা  ‘মুক্তির কথা’ তে লক্ষ করা যায়: এক গ্রামে ঢাল- বর্শা ব্যবহার করে ১৮ জন পাকসেনা এবং দুইজন অফিসারকে হত্যা করে গ্রামের মানুষ।  এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে গ্রামের নারীরাও এবং অনেকে মারা যান। এসকল ঘটনা ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়না, লেখা হয় বড় নেতা, সেনাবাহিনী এবং কিছু রোমাঞ্চকর ঘটনা, যার মাধ্যমে উপেক্ষা করা হয় ইতিহাসের অনেক সাক্ষীদের। মুক্তির কথায় আমরা মান্দি জনগোষ্ঠীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জানতে পারি। তারা বলেন, যুদ্ধে কোনো বর্ণ বৈষম্য ছিলোনা। সকলে একই সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু যুদ্ধের পরে যে ইতিহাস রচনা হলো সেখানে তাদের কোনো কথা লেখা নেই। মান্দিরা আজো অসমতা, নিপীড়নের শিকার  হচ্ছে এবং বঞ্চিত হচ্ছে নূন্যতম সরকারী স্বীকৃতি থেকে। তারেক মাসুদ এভাবে ‘মুক্তির কথা’য় তুলে ধরেন যুদ্ধে নারী এবং মান্দি ( গারো) জনগোষ্ঠীর অবদান। মুক্তির কথা চলচ্চিত্রের শেষাংশে একটি গানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সমাজে উঁচু নিচু শ্রেণিতে কীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে তা দেখানো হয়।  যেমন, “যুদ্ধ করলো চাষার ছাওয়াল মরলো চাষির মাইয়া । যাদের ত্যাগে দেশটা স্বাধীন, তারাই ভাতে মরে”।

বাংলাদেশের দুটি মূলধারার জাতীয়তাবাদী চিন্তা হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ যা মুক্তিযুদ্ধকালীন এক শক্তি, অন্য দিকে স্বাধীনতা উত্তরকালে মুসলিম জাতীয়তাবাদ- বাংলাদেশি। এই দুই জাতীয়তাবাদী ধারণার মধ্যে আমরা খুঁজে পাইনা “আদিবাসীদের”, মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান বা অংশগ্রহণ। এই দুই জাতীয়তাবাদ সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতির সাথে জড়িত। এই চরম মতবাদের কারণে প্রান্তিয়করণ প্রবলভাবে দেখা যায়। আমাদের দৃষ্টি এবং চিন্তা আটকে থাকে এই দুই জাতীয়তাবাদের ডিসকোর্সে!

মাটির ময়না

জাতীয়তাবাদের দুই ধারার প্রভাব আমরা দেখতে পারি আমাদের চলচ্চিত্রগুলোতে, সাহিত্যে, চিত্রকলাতে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদ কতজন মানুষ ধারণ করেন এবং এর বাহিরের মানুষের কথাগুলো কে শুনবে? এই দুই শক্তিশালী জাতীয়বাদের ডিসকোর্স আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং এটিই আমাদের সংস্কৃতি রুপে আমাদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত। তারেক মাসুদের মতে, আমাদের এই ডিসকোর্স এর বাহিরে যে মতবাদ, চিন্তা, সংস্কৃতি রয়েছে তার উন্মোচন করতে হবে বা পাঠ করতে হবে।

তারেক মাসুদের রাজনৈতিক চিন্তা গতানুগতিক রাজনৈতিক চিন্তার বাহিরে, তার আরো  প্রমাণ পাই রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলোতে। ‘মাটির ময়না’ (২০০২) চলচ্চিত্রে আমরা তারেক মাসুদের জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত আরো কিছু দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাই। ‘মুক্তির গান’ এ গানের মাধ্যমে যেখানে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলেন এবং ‘মুক্তির কথা’ চলচ্চিত্রে যেমন তিনি তুলে আনেন প্রান্তজনের কথ্য ইতিহাস, ‘মাটির ময়না’তে তিনি প্রান্তিক মানুষের দেশ, সমাজ এবং ধর্ম নিয়ে আঞ্চলিক রূপের অনন্য দৃষ্টান্ত চিত্রায়ন করেন। জাতীয়তাবাদের প্রভাবশালী মহলের মাঝে এই পপুলার রিলিজিয়ন আমাদের নতুন ভাবনা-চিন্তার খোরাক যোগায়। সকল চিন্তার এই মিশ্রনের মধ্যে দিয়ে আমাদের জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন কীভাবে হচ্ছে তা ভেবে দেখার বিষয়। মাটির ময়না নিয়ে ফাহমিদুল হক এবং প্রনব ভৌমিক মন্তব্য করেন:

“মাটির ময়নায় নির্মাতা সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে সমর্থন করেছেন।মাদ্রাসায় কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের জীবনের চেয়ে আনুর গ্রামের বহু ধর্মের আবহমান সংস্কৃতির প্রতি পক্ষপাত দেখানো হয়েছে।…যেখানে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদ মানুষকে দেখাতে চেয়েছেন একভাবে, সেখানে বহু রকম সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মাতা এসব দৃশ্যে। তারেক মাসুদ মনের করেন জনপ্রিয় লোকধর্মই হচ্ছে যেকোনো চরমপন্থার বিরুদ্ধে একটা রক্ষাকবচ। তিনি এও বিশ্বাস করেন যে, এর কারণেই বাংলাদেশে শরীয়াপন্থীরা গণতান্ত্রিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারবেনা”। ( হক  ও ভৌমিক ২০১৪)

‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদের শৈশবে দেখা পারিপার্শ্বিকের চিত্র এসেছে, এসেছে ১৯৬৯ সালের প্রেক্ষাপটে উঠে আসা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন দিক এবং দ্বন্দ্ব। চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায় করিম বয়াতি মুসলমান জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্বকে বলছেন ‘রাজনীতির খেলা’ হিসেবে, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ নেই। জাতীয় রাজনীতির জাতীয়তাবাদ নিয়ে রাজনীতির খেলায় গ্রামের প্রান্তিক মানুষগুলোর অংশগ্রহণ কতটুকু সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আঞ্চলিক এই সংস্কৃতিকেও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ম্যানিপুলেট (manipulate) করা হয় এবং হারিয়ে যেতে থাকে সুফীবাদের মানব মুক্তির বার্তা এবং জায়গা করে নেয় রক্ষণশীলতা। জাতীয় রাজনীতির প্রভাবে আঞ্চলিক সংস্কৃতিগুলো অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে এবং সংস্কৃতির বহুত্ববাদও ভূলুণ্ঠিত হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটেও আমরা দেখি ‘রাজনীতির খেলা’র ঘূর্ণিপাকে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ হচ্ছেনা, লাভ হচ্ছে রাজনীতির কর্তাব্যক্তিদের। দুই জাতীয়তাবাদের বিতর্কের মাঝে তারেক মাসুদ দেখিয়েছেন লোকজ সংস্কৃতির আদলে গ্রাম-বাংলার চেতনা, দর্শন। জাকির হোসেন রাজুর মতে, “মাটির ময়নায় বিভিন্ন রকম ইসলাম এবং বিভিন্ন রকম বাঙালি পরিচয় দেখানো হয়েছে এবং এইসব বিভিন্ন সুর ও স্রোত আমাদের জাতি গঠনের নিয়ামক। সেটি তারেক মাসুদ বলার চেষ্টা করেছেন” (রাজু,২০১৩)। ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে মিলনের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম এবং ইব্রাহিম হুজুরের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কল্যাণমূলক ইসলাম চর্চার মাধ্যমে ইসলাম কায়েমের কথা। আবার অন্যদিকে করিম বয়াতির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে মানব মনের মুক্তির কথা, যা জাতীয় চিন্তার বাহিরে আধ্যাত্মিক এক চিন্তা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, লোকজ চিন্তা ও দর্শন এসকল কিছু একে অপরের থেকে ভিন্ন মত প্রকাশ করলেও এসকল কিছুর সমষ্টি নিয়েই টিকে আছে বাংলাদেশের মানুষ। চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদ এভাবে উপস্থাপন করেছেন বাঙালির পরিচয় সংকট।

 

দোহাই

মাসুদ, তারেক (২০১২)। চলচ্চিত্রযাত্রা। ঢাকাঃ প্রথমা প্রকাশনা

রাজু, জাকের হোসেন (২০১৩)। ‘তারেক মাসুদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে জাতীয়তাবাদের পরিবেশনা’ শীর্ষক গবেষণার জন্য প্রণব ভৌমিক কর্তৃক গৃহীত সাক্ষাৎকার। ২১ জুন ২০১৩।

হক,ফাহমিদুল ও ভৌমিক, প্রণব (২০১৪)। তারেক মাসুদ জাতীয়তাবাদ ও চলচ্চিত্র। ঢাকাঃ আগামী প্রকাশনী।

Haq, Fahmidul, and Balraj,Santhi(2010) The  Clay Bird: Identity Construction of Bengali Muslims on the screen, Bangladesh Film Archive Journal-3 , Dhaka

[1]  You tube/ Tareque Masud Memorial Trust

 

সাখাওয়াত হোসেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। যোগাযোগ: [email protected]

 

Print Friendly, PDF & Email
0 Shares

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *