গফম্যানের ও আমাদের সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠান

সায়েমা খাতুন

অপরাধীর অভাবে নেদারল্যান্ডে দ্রুতগতিতে জেলখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং কারাভবনগুলোকে শরণার্থীদের আবাস হিসেবে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কয়েদীর সংখ্যা কুড়ি হাজার থেকে সোজা দশ হাজারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে দুনিয়ার অর্ধেকেরও বেশি কয়েদী বাস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার কারাগারে।বাংলাদেশে কারাবন্দীর সংখ্যা ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ এর মধ্যে ৬০-৭০ হাজারের উপরে, মোট জনসংখ্যার বিচারে প্রতি লাখে ৫৩ জন কারাবন্দী। কারাসংস্কার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপে জাতীয় পর্যায়ে বহু জনবিতর্ক রয়েছে, রয়েছে শক্তিশালী গবেষণা। বাংলাদেশে কারাগার এবং অনুরূপ প্রতিষ্ঠান কিভাবে পরিচালিত হয়, তার সমস্যাগুলো কি, তা সহজে বাইরে আসে না। তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিমালা, ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে সাক্ষ্য-প্রমাণভিত্তিক আলোচনায় নিয়ে আসা দুরূহ। সিনেমা-নাটকে-উপন্যাসে- সঙ্গীতে যেটুকু বা মানবিক সংকটের চিত্র দেখা যায়, সাক্ষ্য-প্রমাণভিত্তিক আলোচনা একেবারেই অপ্রতুল। অথচ দেশের হাজারো প্রাণ আর তার সাথে হাজারো পরিবারের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের সাথে এই প্রশ্নগুলো জড়িয়ে আছে। থানা-পুলিশ, জেল-হাজত বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সাথে দুঃখজনকভাবে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে  শক্তিশালী গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে বিচার ব্যবস্থার চোরা ফাঁদে আটকে পড়ে যেতে পারে যে কোন পরিবারের মানুষ। গরীব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়-বিচার পাওয়ার সুযোগ দুর্ভাগ্যজনকভাবে সঙ্কুচিত। কারাগার, সংশোধন কেন্দ্র, মানসিক হাসপাতাল, পাগলাগারদ, পুনর্বাসন কেন্দ্র, এতিমখানা, শরণার্থী শিবির, সেনাশিবির, যুদ্ধবন্দী শিবির, সমুদ্রগামী জাহাজ, হোস্টেল, মিশনারি ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নৃবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সীমানা প্রাচীর ভেদ করে এদেরকে জানা-বোঝার চেষ্টা প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে।কানাডীয় নৃবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান এইসব প্রতিষ্ঠানের অন্তর্নিহিত কাঠামো এবং কর্মকাণ্ডকে বোঝার জন্যে ষাটের দশকের প্রারম্ভে সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানের একটি ধারনাগত পরিকাঠামো পেশ করেন, যেখান থেকে এই ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বোঝাবুঝি তৈরিতে অনেকে অগ্রসর হয়েছেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতেও পণ্ডিত, সংস্কারক এবং আমজনতার জন্যে এই বিষয়ে জরুরী, দায়িত্বশীল ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের পরিসর তৈরিতে নিয়োজিত হওয়া প্রয়োজন।

সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানের চরিত্রের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এর আছে দুই পক্ষঃ  এক দিকে আছে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, কর্মচারী, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান-নিবাসী জনগোষ্ঠী। আধুনিককালের সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের কাঠামোয় অদৃশ্য খুঁটির কাজ করে।সামাজিক পরিচয়ের ক্যাটাগরি তৈরি করে এবং এই ক্যাটাগরিতে সামাজিক কর্তা মানুষ তার কর্মকাণ্ড স্থির করে, যাকে বলে এজেন্সি। মানুষ এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়গুলো ধারণ করে, সেই পরিচয়ে নির্ধারিত হয় এবং সেই পরিচয়ের মুখোশের আড়ালে কথা বলে, কাজকর্ম করে এবং সামাজিক যোগাযোগ করে।উঁচু দেয়াল ঘেরা সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানগুলো জনচক্ষুর আড়ালে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃষ্টির উদ্দ্যেশ বৃহত্তর সমাজের শৃঙ্খলা, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, তথা সমাজের স্বাভাবিক জনজীবন কায়েম রাখা।এতে সমাজের অস্বাভাবিক অসুস্থ,জরুরী অবস্থায় থাকা, আপদকালিন,আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অসমর্থ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বেতনভুক্ত কর্মচারীদের দ্বারা একটি প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে বৃহত্তর সমাজের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়, স্বাভাবিক রাখা হয়।পশ্চিমের সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা সমাজের নিজস্ব নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ উৎসারিত আইনের অনুশাসনে, উচ্চ প্রযুক্তি ও সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার মডেলে পরিচালিত হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপনিবেশিক শাসনের মডেলে, ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করবার কাজে, যার কোন মৌলিক সংস্কার করা হয়নি।এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্ভেদ্য দেয়াল ভেদ করে এর ভেতরের অদৃশ্য সামাজকে বিশ্লেষণের আলোয় নিয়ে আসবার বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব আমাদের রয়ে গেছে।

সেটা শুরু হতে পারে গফম্যানের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে যে, মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের তিনটি পরিমণ্ডলের কর্মকাণ্ড ঘুম, খেলা ও কাজকর্ম – তিনটি পৃথক জায়গায়, ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীদের সাথে, ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের অধীনে, কোন একক যৌক্তিক পরিকল্পনার অধীনে চলে না, কিন্তু সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানে উলটোভাবে এই তিন পরিমণ্ডল লেপটে যায়। এই প্রতিষ্ঠান পূর্ণ আবাসিক ও আনুষ্ঠানিক সংগঠনের দো-আঁশলা চরিত্রের যেখানে একক একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে সামাজিক জীবনের সব কাজ এক স্থানে দৈনিক  রুটিনে ব্যাচভিত্তিকভাবে পরিচালিত হয়। ব্যাচের সবার সাথে এক আচরণ করা হয় এবং কর্তৃপক্ষের একটি নিয়মতান্ত্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সকলকে একইভাবে একই কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে হয়। এই কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং সবার উপরে রয়েছে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আইন-কানুন ও নীতিমালা।  সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানের নিবাসীরা এই প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত হয় একটি ভর্তি প্রক্রিয়ায় নতুন সনাক্তকারী পোশাক, চিহ্ন, নম্বর, বিছানা, ব্যক্তিগত সরঞ্জামাদি ইত্যাদি লাভের আচার-আনুষ্ঠানিকতার সাথে তাদের আগের সামাজিক পরিচয় লুপ্ত হয়ে যায়।তাদের পরিচয় নম্বর দিয়ে, কার্ড দিয়ে হয়ঃ অপরাধী, রোগী, পাগল, এতিম, ক্যাডেট, জওয়ান, রিফিউজি। যেখানে পরিবারে আমরা অল্প মানুষের সাথে বাস করি, সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ এক সাথে বাস করে এবং এমন একটা বড় জনসংখ্যাকে একটা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আশ্রয়ে পরিচালনা করা হয়।সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানের কঠোর প্রাত্যহিক রুটিন অনুসারে তাদের সুপারভাইজারের অধীনে ব্যাচে ব্যাচে একসঙ্গে একইরকম আচার ও কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করতে হয়।

সবচেয়ে বড় বিষয়টি হল সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের সুযোগ অতি সঙ্কুচিত, সদা সতর্ক নজরদারিতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা পুরোপুরি লঙ্ঘিত। মানসিক হাসপাতালের রোগী ও স্টাফদের মধ্যে গবেষণা করে গফম্যান মূল যে জিনিসটি সাব্যস্ত করেন তা হল, রোগ মানুষকে মানসিক রোগী বানায় না, বরং বানায় খোদ হাসপাতাল। মানসিক রোগী তৈরি হয় এই সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের সতর্ক নজরদারি ও নিয়ম-কানুনের জোর-জবরদস্তিমূলক প্রয়োগে, এর নৈব্যক্তিক ও বিমানবিক আচরণের সাথে মানিয়ে চলতে গিয়ে এর প্রতিক্রিয়ায়। কারাগারে কয়েদীদের সাথে স্টাফদের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাখ্যায় গফম্যানের পদাঙ্ক অনুসরণে লোরনা রোডস দেখেন যে, কারাব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায় কয়েদীর অপরাধী পরিচয়ে অধঃপতিত সামাজিক অবস্থান তৈরি হয়, যেখান থেকে সমাজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবার পথ বন্ধ হয়ে যায়।মার্কিন অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, কারাব্যবস্থা অপরাধীর সংশোধনের ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন কারণে সাজাপ্রাপ্ত মানুষদের নৈরাশ্যজনকভবে কারাগারে গুদামজাত করে ভরিয়ে ফেলছে। এতে করে অপরাধ বা অপরাধী কমার পরিবর্তে কারাবন্দীদের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে।

একবার পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে এক রোগী গ্রামে গিয়ে মাছ ধরছিল, তার সঙ্গী তাকে বলে, এই দ্যাখো! তুমি এখন একজন মাছ-শিকারি, পাগল নও! সর্বাত্মক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে গবেষক, সংস্কারক এবং আমজনতার ভাবনা/পুনঃ ভাবনা অতি জরুরী। কেননা এই প্রতিষ্ঠানের নিবাসীরা আমাদের দেশেরই, আমাদের পরিবারেরই একজন।

 

[লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯, দেশ রূপান্তর এ]

সায়েমা খাতুনঃ সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Photo credit: author

 

 

 

 

 

তথ্যসূত্র:

https://www.weforum.org/agenda/2018/02/netherlands-prisons-now-homes-for-refugees/

http://www.prisonstudies.org/country/bangladesh

Goffman, E. (1990). Asylums: Essays on the social situation of mental patients and other inmates. New York: Doubleday.

Rhodes, Lorna A. (2004) Total Confinement Madness and Reason in the Maximum Security Prison. California Series in Public Anthropology. Berkeley, Calif.: University of California Press.

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email
168 Shares

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *