স্বাধীন সেন

এবং পুকুরটিও চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল, পুকুরের আনন্দ বেদনা
পাতা হয়ে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে পৃথিবীতে, এই বিশ্বলোকে।
শাপলার ফুলে ফুলে পাতায় কখনো মিল থাকে, মিল কখনো থাকে না।
(বর্ষাকালে, বিনয় মজুমদার)

আজ তারা কই সব? ওখানে হিজল গাছ ছিল এক – পুকুরের জলে
বহুদিন মুখ দেখে গেছে তার; তারপর কি যে তার মনে হল কবে
কখন সে ঝরে গেল, কখন ফুরাল, আহা, – চলে গেল কবে যে নীরবে,
(আজ তারা কই সব, জীবনানন্দ দাশ)

পুরানো পুকুর বা দীঘি আমাদের এই অঞ্চলের ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় কোনো কালেও তেমন গুরুত্ব পেয়েছে বলে ঠাহর করি নাই। ঔপনিবেশিক ও পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী শর্তাধীনে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চর্চার যে গতিপ্রকৃতি তাতে বিশেষ কিছু ‘বস্তু বা নিদর্শন’ গবেষকদের অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ‘প্রত্নবস্তুতে’ রূপান্তরিত হয়েছে। যে-কোনো সুবৃহৎ কিংবা অলঙ্কৃত স্থাপত্য, ভাস্কর্য, মুদ্রা, শিলালিপি, তাম্রপট্ট, পোড়ামাটির চিত্রফলক আর নিদেনপক্ষে কয়েকটি বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্র প্রত্নতত্ত্ববিদদের ইতিহাস বর্ণনা ও লিখনে কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। এখনো মূলধারার চর্চায় একই প্রবণতা। তার কারণ আছে বিভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রত্নতত্ত্ব চর্চার পরম্পরায় অতীত ‘গৌরব’ ও ‘স্বর্ণযুগের’ ধারণার উপস্থাপন ও পরিবেশনে উপযোগী হিসাবে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন বাছাই করা হয় ও সুনির্দিষ্ট ভঙ্গিতে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। সমসাময়িক কালে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারকে ‘অতিরঞ্জিত করে রোমাঞ্চকর ও অনন্য’ হিসাবে প্রচার করার জন্যও এই সব নিদর্শন উপযোগী বেশি। পুকুর বা দীঘি তো সামান্য এবং তুচ্ছ নিদর্শন। ‘অসামান্যতা’ আর ’সামান্যতা’, ‘সাধারণ’ আর ‘অনন্যের’ সীমানা কী-ভাবে আমাদের ইতিহাস ও
প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় তৈরি হল তা নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা করা যায়। আপাতত, ওই পথে আমি হাঁটব না। এই লেখার উদ্দেশ্য ভিন্ন।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে গত পনের বছরের কাজে আমাদের প্রথম ও প্রধান অবলম্বন যাকারিয়া স্যারের ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইটি, যেটি সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে। প্রথম দিকের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে আমরা সব ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক আলামতের/নিদর্শনের জমির উপরে (ও নিচে) উপস্থিতিকে ‘প্রত্নস্থান’ হিসাবে নথিভুক্ত করা শুরু করি। এদের মধ্যে পুরানো বিভিন্ন পুকুর বা দিঘীর ঘাটের নিদর্শনও ছিল। এই অঞ্চলের প্রত্নস্থান নিয়ে যাকারিয়া স্যারের বর্ণনায় সংলগ্ন বিভিন্ন পুকুর, দিঘী ও জলাশয়ের উল্লেখ আছে। ২০০৫ এর পরে নিবিড় ও সামগ্রিক জরিপের কাজ করতে গিয়ে পুকুর/দীঘিগুলোর মাহাত্ম টের পেলাম। বা বলা ভালো আ ক ম যাকারিয়া আমাদের পুকুর/দীঘির তাৎপর্য বোঝার দিকে নজর দিতে বাধ্য করলেন।

আদি মধ্যযুগে (খ্রি. ৬ষ্ট শতক – ১৩শ শতক) গৌড় ও বরেন্দ্র নামে পরিচিত এই অঞ্চলে অসংখ্য পুকুর বা দীঘি খোড়া হয়েছে। রাজা বা সামন্তগণ ধর্মীয় স্থাপনার মত এই পুকুর/দীঘি খোঁড়ায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন। জনসমষ্টির উদ্যোগও ছিল বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং সেচের কাজে জল ব্যবহারের জন্য পুকুর/দীঘি খনন করায়, সেগুলোর উঁচু পাড়ে ফলজ বৃক্ষ রোপনে। ধর্মীয় স্থাপনার সঙ্গে পুকুরের/জলাধারের অবস্থান শাস্ত্র অনুমোদিত। শত শত পুকুর/দীঘিকে একারণেই আমরা প্রথম অন্যান্য নিদর্শনের মতই গুরুত্ব দিতে শুরু করি। কাজ এগুনোর সঙ্গে সঙ্গে আমরা লক্ষ করি, কেবল ওই সময়ের জল ব্যবস্থাপনার ধরন, বৈশিষ্ঠ্য ও ইতিহাস বোঝার জন্যই পুকুর/দীঘিগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওই সময়ের মানব বসতিগুলো জমির উপরে কী-ভাবে বিন্যস্ত ছিল, আর বসতিগুলোর আকার কেমন ছিল, প্রকার কেমন ছিল, এক বসতির সঙ্গে অন্য বসতির সম্পর্ক কেমন ছিল, বসতিগুলো কী-ভাবে পরিবর্তিত হলো, বা কেনইবা পরিবর্তিত অথবা পরিত্যক্ত হলো, তা বোঝার জন্য এখানকার নদী ও জমির ইতিহাসের পাশাপাশি পুকুর/দীঘির ইতিহাস বোঝাও সমান জরুরি। আমাদের এই উপলব্ধিতে পৌছালাম আ ক ম যাকারিয়ার সঙ্গে যাত্রা করে। পুকুর/দীঘির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা আর এখানে করব না। এই আলোচনা ছিল প্রসঙ্গে আসার উছিলা। আসল গল্পে ফিরে আসি এবারে।

আমরা এখন কাহারোলের মাধাবগাঁওয়ে খনন করছি। গতকাল (২৮ জুলাই, ২০১৬) আমরা (আমি, শুভ, দিদার, মাসুম, নাসিম ও শহীদুল ভাই) কাহারোল উপজেলার ভেলওয়া গ্রামে যাই। আমি ও শুভ বাদে কেউই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে প্রত্নতত্ত্ব শেখেনি। দিদারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ২০০১ সালে বিরামপুরের চন্ডীপুরে জরিপ করার সময়। তখন ও ক্লাশ সিক্সে পড়ে। তারপরে পড়াশুনা বেশি না আগালেও, আমাদের জরিপ ও খনন কাজে অংশনেয়ার মধ্য দিয়ে ও মাঠ প্রত্নতত্ত্বের কাজ অনেকটাই শিখে গেছে। মাসুমও তেমনই ভাবে গত তিন বছরে অনেক কাজ জেনে গেছে। শহীদুল ভাইয়ের ইজি বাইক হলো গত বছর থেকেই আমাদের বাহন। উনি সারাদিনই আমাদের সঙ্গে থাকেন আর নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন কাজ করেন। নাসিম কাহারোলের ছেলে। সাইকেলে করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরা ওর স্বপ্ন।

২০১৪ সালের জরিপে এখানকার প্রত্নস্থানগুলো আমরা নথিভুক্ত করেছিলাম। যাকারিয়া স্যার তার বইয়ে এই গ্রাম থেকে একই সঙ্গে একটি জৈন প্রতীমা, একটি বৌদ্ধ প্রতীমা, একটি ব্রহ্মা প্রতীমা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রতীমাগুলোর প্রাপ্তিস্থান বর্ণনা করেছেন তিনি ওইখানকার পুকুর ও দীঘির অবস্থানের সাপেক্ষে। তাঁর বর্ণিত প্রত্নঢিবিগুলো অনেক আগেই স্থানীয় মানুষজনের হাতে ধ্বংস হয়ে যায়। একই স্থানে তিনটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবতার উপস্থিতি হওয়ায় ঘটনাকে যাকারিয়া স্যার কৌতুহলউদ্দীপক হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আমাদের ভেলওয়া সম্পর্কে আগ্রহেরও প্রধান কারণ এটি।

১৯৬৯ সালে তিনি এই গ্রামে এসেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক। কাহারোলের একটি বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রী গোপেশ চন্দ্র রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আপনারা তো দেরি করে ফেলেছেন। স্থানীয় যে মানুষটি তখন তার সঙ্গে ছিলেন তিনি তো মারা গেছেন দুই বছর আগেই। তিনি বেঁচে থাকতে যদি আসতেন তাহলে জানতে পারতেন কোন স্থান থেকে কোন প্রতীমা পাওয়া গেছিল।’ আমরা ওই গ্রামে পুনরায় জরিপে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানালে গোপেশ স্যার আমাদের সঙ্গ দিতে রাজি হন আগ্রহের সঙ্গে।

আমরা যাই ভেলওয়া গ্রামে। গিয়ে দেখি গোপেশ স্যার ওই গ্রামের বয়স্ক মুরুব্বিদের মধ্যে একজন – শ্রী পশুপতি রায়কে আগেই বলে রেখেছেন। পশুপতি রায়ের বয়স এখন আশি। তার উঠোনোই আমরা বসলাম। অশতিপর এই ভদ্রলোক ১৯৬৯ সালের এই গ্রামে প্রতীমা নিতে আসা এক ডিসি সাহেবের গল্প বললেন। তিনি জানালেন, ডিসি সাহেব খুবই ভদ্রলোক ও বিনয়ী ছিলেন। জোর করে বা প্রশাসনিক ক্ষমতা দেখিয়ে তিান ওই প্রতীমাগুলো নিয়ে যাননি। ‘ডিসি সাহেব সবাইকে ডেকে বললেন আপনারা যদি এই প্রতীমাগুলোর পূজা করেন তাহলে আমি এগুলো নেব না। তবে সব প্রতীমা তো আমরা চিনি না, বা পূজাও করি না। আমাদের পূজার জন্য তিনি একটি নারায়ন প্রতীমা (সম্ভবত বিষ্ণু প্রতীমা) রেখে গেলেন। তখন তার সঙ্গে ছিলে প্রফেসর কোবাত সাহেব। ওই নারায়ন প্রতীমা পরে চুরি হয়ে যায়।’ – বলতে থাকেন পশুপতি রায়। তার বাড়ীটির সামনেই একটি ঢিবির অবশিষ্টাংশে প্রতিষ্ঠিত ‘ঠাকুরের থান’। উপরে একটা বটগাছ। মাটি দিয়ে উঁচু করে থান বানানো। পাশেই পড়ে আছে একটি পাথরের টুকরা যেটি কোনো স্থাপনার অংশ ছিল। প্রতিমাসে এখানে এখনো হরিবাসর আর নাম-সংকীর্তন হয়। কিছু দুরের বাঁশঝাড় খুড়তে গিয়ে ওই জৈন তীর্থঙ্করের প্রতীমাটি পাওয়া যায় আরো ছোট ছোট অন্য প্রতীমার সঙ্গে। পরে সেটা নিয়ে এসে বর্তমান থানের উপরে বটগাছের কাছে রাখা হয় বলে তিনি জানান। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী কয়েকজন বলেন, জৈন প্রতীমাটি শুরু থেকেই বটগাছের কাছে ছিল। এ-মতভিন্নতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কারণ বাঁশঝাড় আর বর্তমানে থানের মধ্যে দুরত্ব ৮-১০ ফুট। সম্ভবত, একই ঢিবির অংশ ছিল। আবার, একই দেবালয়ে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতীমা উপাসনা হওয়াও ইতিহাসে নজিরবিহীন নয়।
মাঠে কাজ করার সময় আমরা যা করি তা যে সামগ্রিক ভাবে নৈর্ব্যাক্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে না সে বিষয়ে এন্তার আলাপ-বাহাস রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, নৃবিজ্ঞানসহ সমাজ বিজ্ঞানের শাস্ত্রগুলোতে। কর্তাসত্তাশ্রয়ীতা/সাবজেকটিভিটি কিংবা আন্তঃকর্তাসত্তাশ্রয়ীতা/ইন্টারসাবজেকটিভিটি আমাদের দেখার, বোঝার ও ব্যাখ্যা করার ধরন-ভঙ্গি-পদ্ধতিকে গঠন করে, আকার দেয় ও বদলে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিক হিসাবে বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠার অসম্ভব চেষ্ঠা করার চাইতে অনেক জরুরি হয়ে দাঁড়ায় কাজে-বিবরণীতে-লিখনীতে নিজ সত্তার সঙ্গে মোকাবেলা করতে থাকা। পারিভাষিকভাবে একেই বলে আত্ম-প্রতিবর্তীকরণ/সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভিটি। মাঠে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্মৃতি-অনুভূতি-অনুশীলন প্রবলভাবেই উপস্থিত থাকে। শ্রী পশুপতি রায়ের বাচনভঙ্গী ও দেহভঙ্গী ছিল আমার কাছে স্মৃতিউদ্রেককারী। তাকে দেখে মনে পড়ল। শৈশবে দেখা বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক জয়ন্ত স্যারের কথা। খাটো করে ধুতি পড়া জয়ন্ত কুমার দাশগুপ্তকে দেখতাম। বিন¤্র ভঙ্গিতে হেঁটে যেতে। তখন তো আর জানি না যে, ‘মনসা মঙ্গল’ নিয়ে অসাধারণ গবেষণা করেও তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি পান নাই, যদিও তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আরেক দিকপাল শশীভূষণ দাশগুপ্ত। পরে, ওই গবেষণাই গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। পশুপতি রায় জয়ন্ত স্যারের মতন শিক্ষক ছিলেন না। কোবাদ আলী স্যারের অনুজ মোজাম্মেল হোসেন সাহেবও শিক্ষক ছিলেন না তাঁর বড় ভাইয়ের মত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পরে চাকুরী করে এখন অবসর নিয়েছেন। ভেলওয়ায় তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলার পরে ফোনেও বেশ কয়েকবার উনার সঙ্গে আলাপ করেছি। এই দুটি মানুষের দেহভঙ্গী ও বাচনভঙ্গীর কোমল নম্রতা ও দৃঢ়তা, বড় হয়ে ওঠার পথে সাক্ষাৎ হওয়া অনেক মানুষের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। মনে করিয়ে দিচ্ছিল যাকারিয়া স্যারের বিনয়ের কথাও। আমরা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মাননা দেব, এই কথা যখন যাকারিয়া স্যারকে জানাই তখন তিনি আমাকে বলেন, ‘আমি এই সম্মাননার যোগ্য নই’। সম্মাননা প্রদানের দিন ভাষণেও তিনি একই কথা বলেছিলেন। এই বিনয়, নিরহঙ্কার ও নম্রতা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই এখন আর দেখি না।

অধ্যাপক কোবাদ আলী ছিলেন বীরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের বাংলার শিক্ষক। তিনি ঘুরে বেরাতেন ঐতিহাসিক নিদর্শনের খোঁজে। জানালেন তাঁর বন্ধু গোপেশ স্যার ও তাঁর অনুজ মোজাম্মেল হোসেন সাহেব। কোবাত আলী স্যার গত হন ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে। সঙ্গে করে নিয়ে যান এই এলাকার ইতিহাসের আর যাকারিয়া স্যারের সঙ্গে মাঠে জরিপকালে সঙ্গ দেয়ার স্মৃতি। যাকারিয়া স্যার বা কোবাত আলী স্যারদের ছায়াসঙ্গী করেই আমরা দেখছিলাম পুকুর, দীঘি, থান, কেটে ফেলা ঢিবি, প্রতীমা খুঁজে পাওয়ার সেই বাঁশঝাড় আর মানুষ।

‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইটি পড়ে পড়ে যাকারিয়া স্যারে বর্ণনা অনুসরণ করে হারিয়ে যাওয়া প্রতীমা, মানুষ আর প্রত্নঢিবির অবস্থান বোঝার চেষ্টা করলাম। দুটি পুকুর। স্থানীয় লোকজন বলেন ‘ছোট সুসকাই’ আর ‘বড় সুসকাই’। গোপেশ স্যার জানালেন, এই পুকুর দুটির আসল নাম ‘শৌচকায়’, যা সূচি হওয়া বা পবিত্র হওয়া থেকে এসেছে। পুরানো দলিল ঘেটে এই নাম জানা গেছে। উত্তরে আরেকটি পুকুরের নাম ‘পাপাহার’ (পাপকে আহার করে যে পুকুেরর জল)। একটি পুকুরের মধ্যে জঙ্গল হয়ে গিয়েছিল বলে তার নাম ‘দলপুকুর’। কাছেই সবচাইতে বড় পুকুরটির নাম ‘বায়ান্ন দীঘি’। বায়ান্ন বিঘা জমির কেটে খোঁড়া বলে।

স্থানীয় অধিবাসীরা ঢিবিগুলো কেটে সমান করে ফেলেছে বহু আগে। পুকুরগুলোর উঁচু পাড়ও কেটে সমান করে ফেলা। এই এলাকার মালিকানা দেশভাগ পূর্বকালে ছিল শরৎ চৌধুরীদের। দেশভাগের পরে ভূসম্পত্তি বিনিময় করে ভারত থেকে এখানে আসেন একদল মানুষ। নতুন বসতি তৈরি করেন। তারা ও থেকে যাওয়া স্থানীয় অন্য অধিবাসীরা ঢিবিগুলো কেটে সমান করে ফেলেন। নতুন বসত গড়েন। বায়ান্ন দীঘির পাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। ভেলওয়া গ্রামের বর্তমানে বসবাস করা অনেক পরিবারই ১৯৪৭ সালের পরে সম্পত্তি বিনিময় করে এখানে এসেছেন। আশ্চর্য! সেই আদি মধ্যযুগের মত পুকুরগুলো এখনো বসত গড়ে তোলার কেন্দ্র হিসাবে কাজ করছে। সেই গ্রাম, গ্রামের উপাসনালয় লুপ্ত হয়ে গেছে। পুকুরগুলো থেকে গেছে দেশভাগের পরে আপন বসত ছেড়ে আসা উদ্বাস্তু মানুষের নতুন বসতি, নতুন জীবনের, নতুন স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে।

কোবাদ আলী স্যারও দেশভাগের পরে এখানে চলে আসা পরিবারের একজন। তিনি এখানকার প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস বোঝায় সঙ্গ দিয়েছিলেন যাকারিয়া স্যারকে। বায়ান্ন দীঘির পাড়ে সাঁওতালপাড়ায় বসে কথা বলার জন্য সবচেয়ে মুরুব্বি – নাতার মুর্মুকে খুঁজে বের করলেন গোপেশ স্যার। তিনি তার নিজের বয়স কত জানেন না। তিনি জানালেন, এই বায়ান্ন দিঘী একসময় জলজ জঙ্গলে (স্থানীয় ভাষায়, দল) ভরে গিয়েছিল। আরো শুনলাম, দীঘির মালিকানা নিয়ে মোকদ্দমা চলছে এখন। তা চলুক। কিন্তু যাকারিয়া স্যার, কোবাদ আলী স্যাররা কোথায় গেলেন? ১৯৬৯ সালের ভেলওয়া, প্রতীমা সংগ্রহ, প্রত্নঢিবি, বায়ান্ন দিঘী, শৌচকায় ও পাপাহার পুকুরের গল্প তো তাদের কাছ থেকে শোনা হল না।

এই অঞ্চলে শত সস্র পুকুর ও দীঘির নাম আমাদের আজও জানা হয় নাই। আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার রাজনীতিতে পুকুর ও দীঘি নির্ভর এই অঞ্চলের পরম্পরাগত পানি ব্যবস্থাপনা বহু আগেই পরিত্যাক্ত হয়ে গেছে। এই জলাশয়গুলোর কত বিচিত্র নাম। সেসব নামের কত ব্যঞ্জনা। তাদের নিয়ে কত জাদুর গল্প এখনো লোকের মুখে মুখে ফেরে। পুকুরগুলো তো বেশিরভাগই এখন খটখটে শুকনো। উঁচু পাড় কেটে সমান করে চাষের জমি বানানো হয়েছে অনেক পুকুর আর দীঘি। যে মানুষগুলো এসব পুকুর খুঁড়েছিলেন বা পুকুরের জল ব্যবহার করতেন তারা তো আমাদের শ্রুতি ও স্মৃতি থেকে বিলীন হয়ে গেছেন সেই কবেই। একসময় যে মানুষগুলো ঘুরে ঘুরে পুরানো জিনিস, নিদর্শন, পুঁথি, গল্প, রূপকথা, পুকুর/দীঘি ও তাদের নাম খুঁজে বেড়াতেন, তারাও সবাই হারিয়ে গেছেন। অনেক পুকুর টিকে আছে আজও। কেউ কি ভবিষ্যতে কোনোদিন এই পুকুর, দীঘি, জলাশয়গুলোর নাম জানার চেষ্টা করবে? লিখে রাখবে তাদের কথা ও অলৌকিক কাহিনী? তাদের সঙ্গে লিপ্তলৌলিক মানুষগুলো এখন অলৌকিক। পুকুর ও দীঘি আর তাদের নিয়ে নানান অলৌকিক গল্পগুলো কি হারিয়ে যাবে কোনো এক দিন আমাদের সামষ্টিক বিস্মরণের তোড়ে? হেরিটেজ সংরক্ষণের জন্য এখন কত টাকা, কত সেমিনার, কত কথা। আমাদের এই নাগরিক হেরিটেজ-প্রেমে পুকুর ও দীঘির মত প্রত্নস্থান ব্রাত্য। গুরুত্বহীন। অলাভজনক। কেননা সর্বজনের জীবনযাপনের সঙ্গে জমির, নদীর, পুকুরের সম্পর্কের ইতিহাস দিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদী দম্ভ ও বাসনাপ্রকাশ করা যায় না। এই বিষয় নিয়ে গবেষণায় টাকাও দেবে না হয়ত কেউ।

পাড়ে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের কাদা থেকে মাছ ধরার কসরৎ দেখতে দেখতে বায়ান্ন দিঘীর জলের দিকে তাকালাম। কাঁঠাল গাছের ছায়ায়, সন্ধ্যার আবছা আলোয় সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে মনে হলদীঘির জলের মধ্য দিয়েযাকারিয়া স্যার দেখছেন।জলের দর্পনে আ ক ম যাকারিয়ার এই অলৌকিক মুখদর্শন কি আমার বিভ্রম?

কলেজ রোড, সেতাবগঞ্জ। ৩০ জুন ও ১ জুলাই, ২০১৬।
লেখাটি ইতোপূর্বে ফেসবুকে নোট আকারে প্রকাশিত। সাম্প্রতিক.কম-এ ‘প্রতœতত্ত্বের লৌকিক-অলৌকিক’ মাঠে সিরিজের আওতায় ব্লগ হিসাবে প্রকাশিত।

স্বাধীন সেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক।

Print Friendly, PDF & Email
0 Shares

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *